jagannathpurpotrika-latest news

আজ, ,

সর্বশেষ সংবাদ
«» মৌলভীবাজারে জাতীয় ছাত্রসমাজের ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত «» ছাত্র মজলিস গোলাপগঞ্জ উপজেলা উত্তর ও পৌর শাখার সংবর্ধনা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত «» বড়লেখায় ছাত্র মজলিস বৃহত্তর খলাগাঁও শাখার ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত «» ঐতিহ্যবাহী বিশ্বনাথ প্রেসক্লাবের কর্মকান্ড সর্বমহলে প্রসংশিত- শফিকুর রহমান চৌধুরী «» জগন্নাথপুরে গুপ্তধনের সন্ধ্যানে জমিয়ত নেতা মাওঃ ইমরান আহমদ «» গোয়াইনঘাটে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১ আহত ২০ «» জগন্নাথপুরে সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামী গ্রেফতার «» জগন্নাথপুর থানার এক পুলিশ অফিসার গরু চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্লোজ করা হয়েছে «» এমন দেশে বসত, বেশির ভাগই অসৎ «» ফলোআপ : বিশ্বনাথে শিশু খাদিজা হত্যা রহস্য নিয়ে অন্ধকারে পুলিশ



মাওলানা বরকতপুরী মাটি আর মানুষের সাথে সম্পর্কিত মানুষ ছিলেন তিনি মানুষের জন্য কিছু করে মানুষের মন জয়ে সক্ষম হয়েছেন

সৈয়দ মবনু :
মি কখনও দুষ্ট ছিলাম কি না তা জানি না। তবে নিজের অধিকার আদায়, নিজের অধিকারের জন্য লড়াই, নিজে যা সত্য বুঝি তা অকপটে স্বীকার ইত্যাদিতে আমি কোনদিন পিছু ছিলাম না। আজও নয়। এখানেই সমস্যা হতো অন্যের সাথে। এখানেই আমি বেয়াদব, এখানেই আমি প্রান্তিক, এখানেই আমি দুষ্ট এবং চঞ্চল। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের দিকের কথা, তখন আমি হযরত শাহ জালাল ইয়ামনি (র.)-এর মাজারের নিকটস্থ জামেয়া কাসিমূল উলূম দরগাহে হযরত শাহ জালাল (র.) মাদরাসায় হিফজ বিভাগে কোরআনের নাজেরানা পড়ি। একদিন মাদরাসার অফিসকক্ষের পাশেই কোন একজনের সাথে আমার পাঁচ টাকা নিয়ে জগড়া চলছে। একজন হুজুর অফিসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে ডেকে ধমক দিলেন। তিনি ঘটনা না বুঝে ধমক দিয়েছেন বলে আমি মেনে নিতে পারলাম না। আমি পাল্টা প্রতিবাদ করলাম তাঁর ধমকের। তিনি নিরবতা অবলম্বন করলেন, কারণ তিনি নতুন এসেছেন এই মাদরাসায়। তাঁর বাড়ি বরকতপুর, সবাই তাঁকে ডাকতে থাকে বরকতপুরী। বরকতপুর কোথায় তা আমি জানি না। ছোট মানুষ, এসব নিয়ে ভাবনা নেই। তবে বরকতপুরী শোনলে কেমন একটা ‘বরকত’-‘বরকত’ মনে হয়। পরে জানতে পারি, বরকতপুর হলো গহরপুরের কাছে। গহরপুর আমি জানতাম, মাওলানা নুর উদ্দিন গহরপুরীর সাথে আত্মীয়তার সূত্রে। বরকতপুরীর নাম হলো, মাওলানা আব্দুল বাসিত।

 

দরগাহ মাদরাসায় হিফজ বিভাগ হলো গজার মাছের পুকুর আর সোনার কই-মাগুরের পুকুরের মধ্যখানে। ক্লাসে আমার পাশে একটা ছেলে বসলো, যার চোখে বেশ পাওয়ারি চশমা লাগানো। নাম তার ‘ওয়েস’। আমি তো ছোটবেলা থেকেই প্রেমিক। পাশাপাশি বসতে বসতে ওয়েসের সাথে আমার প্রেম কিংবা বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। তখনও আমাদের এই বয়স হয়নি যে বাড়ি-ঘর জিজ্ঞাস করে বন্ধুত্ব করার। কিছুদিন যাওয়ার পর জানতে পারি ওয়েস হলো মাদরাসায় নতুন আগত শিক্ষক বরকতপুরীর ছেলে। বরকতপুরী হুজুরের সাথে আমার প্রথম পরিচয় সুখকর ছিলো না বলেই প্রথম দিকে তাকে কেমন অসহ্য মনে হতো। কিন্তু যখন জানলাম তিনি ওয়েসের বাবা, তখন থেকে আটকে যাই অজানা প্রেমে। এখন অনুভব করি, বন্ধুত্বের প্রেম আমার কাছে আজকের মতো অতীতেও গুরুত্ব ছিলো। ওয়েসের সাথে আমার যোগাযোগ নেই অনেকদিন হলো, কিন্তু সেই প্রেম, সেই বন্ধুত্ব আমি এখনও বুকে বহন করে চলছি। ওয়েসের ভাইরা সবাই আমার কাছে ছোটভাই হয়েই আছে মান, অভিমান, রাগ, প্রেম ইত্যাদির মধ্যে। বরকতপুরীহুজুর দরগাহ মাদরাসায় প্রথম দিকে দারুসসুন্নাহে থাকতেন এবং তিনি সেখানের দায়িত্বশীল ছিলেন। মাদরাসার হোস্টেলে থাকতো যারা ওদের অনেকের সাথেই আমার বন্ধুত্ব ছিলো। ফলে অনেক শক্ত শাসনের মুখোমুখি থেকে ওরা আমার সাথে দেখা করতো। তবে দরগাহ মাদরাসায় থাকতে আর কোনদিন তাঁর মুখোমুখি আমাকে দাঁড়াতে হয়নি। আমি বন্ধুর বাবা হিসেবে তাঁকে সম্মানের সাথে এড়িয়ে চলতাম। অবশ্য পরে জানতে পারি তিনি আমার বন্ধু মসরুরের বড়ভগ্নিপতি। মসরুর হলো সিলেটের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা ওয়ারিছ উদ্দিন হাজিপুরী (র.)-এর ছেলে।
দরগাহ মাদরাসা থেকে আমি ইংল্যান্ড চলে যাই। কোনদিন বরকতপুরীর সাথে আমার ঘণিষ্ট সম্পর্ক হয়নি। তিনি আমাদের বাসায় আসতেন, আমার বাবার সাথে তাঁর খুব ঘণিষ্ট সম্পর্ক ছিলো। আমার ধারণা ছিলো বরকতপুরী হয়তো সেই প্রথমদিনের কথা মনে নিয়ে আমাকে অপছন্দ করেন। পরে অনুভব করলাম তিনি এই চরিত্রের নয়। আমার এক ভাতিজা (ফুফুতো ভাইয়ের ছেলে)-র সাথে বরকতপুরীর মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর থেকে তিনি হয়ে গেলেন আমার বেয়াই। কোথাও দেখা হলে তিনি মুসকি হেসে ‘বেয়াই’ সম্বোধন করে কথা বলতেন। প্রেম যে কথা না বলেও একের অন্তর থেকে অন্যের অন্তরে চলাফেরা করে তা অনুভব করি তিনি যখন আজাদ দ্বীনি এদারার সভাপতি ছিলেন। তখন সিলেট আলিয়া মাদরাসার মাঠে আজাদ দ্বীনি এদারার পক্ষ থেকে পাগড়ী প্রদান অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটা স্মারক প্রকাশিত হয়। এই সময় একদিন আম্বরখানা এক দোকানে বরকতপুরীর সাথে আমার দেখা। আমি মুসাফা করলে তিনি হাতে ধরেই বললেন, ‘আমার খুব ইচ্ছে ছিলো আজাদ দ্বীনি এদারার ম্যাগাজিনে তোমার একটা লেখা থাকুক। কিন্তু একটি মাদরাসার কর্তৃপক্ষের বিরোধীতার কারণে তা সম্ভব হলো না।’ এদিনই আমি অনুভব করলাম, বরকতপুরির অন্তরে আমার প্রতি প্রেম।

 

পরে শায়খে রেঙ্গা (র.)-এর নাতিন জামাই মাওলানা কবির খান এবং মাওলানা শমসের হারুনুর রশীদ আমাকে একই কথা বললেন। তারা দুজন আজাদ দ্বীনি এদারার সেই মিটিং-এ উপস্থিত ছিলেন। এসব ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের কথা।

 

মসরুরের ছোট বোনের স্বামী মাওলানা তুতিউর রহমান উদ্যোগ নিলেন তাঁর শশুড় হযরত মাওলানা ওয়ারিছ উদ্দিন হাজিপুরী (র.) জীবনী-স্মারক প্রকাশের। তিনি উপদেষ্ঠা হিসাবে প্রথমে রাখলেন তাঁর বড় ভায়রা মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরীর নাম, দুই নম্বারে ভার্থখলার প্রিন্সিপাল মাওলানা মজদুদ্দিন আহমদকে। তিনি যখন বরকতপুরী হুজুরের কাছে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শের জন্য গেলেন তখন বরকতপুরী হুজুর এমন কিছু পরামর্শ দিলেন যা শোনে আমার ধারণা হলো তিনি শিল্পবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন। তিনি তিতুউর ভাইকে বলে দিলেন, বানান ও বাক্য গঠনের দিকে নজর রেখে সম্পাদনা করতে হবে। তিতুউর ভাই বিষয়টি আমার কাছে উপস্থাপন করলে আমি এ বিষয়ে ফায়যুর রহমান এবং আবু যর রেজওয়ানের সমন্বয়ে একটি সম্পাদনা বোর্ড গঠন করে দেই। তারা তিনজন লেখা সংগ্রহ, সম্পাদনা ইত্যাদি শেষ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক কারণে তিতুউর ভাই আর স্মারকটি বের করতে পারলেন না।

 

মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী যখন আল্লামা আব্দুল্লাহ হরিপুরী (র.) এর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসাতুল বানাত বারুতখানা’র পরিচালনার দায়িত্ব ভার গ্রহন করেন তখন তাঁর পক্ষ থেকে দুজন শিক্ষক আমাদের জামিআ সিদ্দিকিয়ায় আসেন আমরা কীভাবে কওমী মাদরাসার সাথে জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের সমন্বয় করেছি তা জানতে। ওরা যখন প্রথমে বরকতপুরী হুজুরের পক্ষ থেকে আমাদের প্রতিষ্ঠানে আসার অনুমতি চাইতে ফোন করেন তখন আমি আশ্চর্য হই তাঁর চিন্তার উচ্চতা দেখে। বরকতপুরী হুজুরের মধ্যে যে ছোটদের কাছ থেকেও গ্রহণের মানসিকতা ছিলো সেদিন আমি বুঝতে পারি। সাথে সাথে আমার মনে হয় জামিআ সিদ্দিকিয়া প্রতিষ্ঠা করা আমাদের সার্থক হয়েছে। ওরা যখন বললেন, চাইলে হুজুর আপনার সাথে নিজে আলাপ করবেন। আমি তখন লজ্জিত হয়ে বলি, তিনি যে লোক পাঠাবেন জানার জন্য এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া। ওরা দুজন শিক্ষক আসেন, আমার সাথে বৈঠক করেন। আমাদের ক্লাসগুলো পর্যবেক্ষন করেন।
১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ থেকে আমি ছিলাম নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টায় উপজেলায়। ১৬ ডিসেম্বর বিকালে আমাকে মাওলানা আবু সাইদ মোবাইল করে বললেন, বরকতপুরী হুজুর মারাগেছেন। আমি সাথে সাথে বলি, ইন্না লিল্লহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দূরত্বের কারণে জানাযায় উপন্থিত হতে পারিনি।

 

বিভিন্নসূত্রে জানতে পারি মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিলো প্রায় ছোয়াত্তর বছর। আল্লামা বরকতপুরী গ্রামের প্রাইমারি স্কুল এবং মসজিদের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। এরপর তাঁর ভগ্নিপতি বৃহত্তর সিলেটের স্বনামধন্য আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা ফখরুদ্দিন (র.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দারুচ্ছুন্নাহ গলমু কাপন মাদরাসায় ভর্তি হন। হযরত মাওলানা ফখরুদ্দিন (র.) ছিলেন শায়খে কৌড়িয়া (র.)-এর সময়ে আজাদ দ্বীনি এদারা বোর্ডের সেক্রেটারী এবং পরতবর্তীতে সভাপতি। বরকতপুরী অতপর তৎকালিন সময়ে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ঢাকা উত্তর রানাপিং মাদরাসায় ভর্তি হয়ে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন। এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শায়খুল হাদিস আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (র.)-এর ছাত্র আল্লামা রিয়াছত আলী শায়খে চৌকরিয়া (র.)। কিছুদিন মাওলানা বরকতপুরী (র.) জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া, লালবাগ, ঢাকায় পড়েন। এরপর তিনি হাদিস এবং তাফসিরে উচ্চজ্ঞান অর্জনের জন্য পাকিস্তানের করাচীতে অবস্থিত বিন্নুরী টাউন মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি শায়েখ ইউসুফ বন্নুরী (র.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন।

 

মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী (র.)-এর কর্ম জীবনের শুরু দারুচ্ছুন্নাহ গলমুকাপন মাদরাসায় সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি জামেয়া ইসলামিয়া হোছায়নিয়া গহরপুর মাদরাসায় সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। অতঃপর একাশি খ্রিস্টাব্দের দিকে তিনি জামেয়া ক্বাসিমুল উলুম দরগাহে হযরত শাহ জালাল মাদরাসায় সিনিয়র মহাদ্দিস এবং দারুচ্ছুন্নাহ ছাত্রাবাসের প্রধান সুপার হিসাবে যোগদান করেন। দরগাহ মাদরাসায় তিনি ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হাদিসের সম্মানিত শিক্ষক হিসাবে এবং অন্যান্য দায়িত্ব পালন করলেও চাকুরিতে ছিলেন বলা যাবে না। বেশির ভাগ সময়ই তিনি অসুস্থ্য ছিলেন।

 

মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী (র.) জীবনে সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তবে তিনি প্রথমদিকে তাঁর ভগ্নিপতি মাওলানা ফখরুদ্দিন (র.) কর্তৃক রাজনৈতিক চিন্তায় কিছুটা প্রভাবিত ছিলেন। এই সূত্রে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাথে তাঁর আজীবন হৃদয়ের সম্পর্ক ছিলো। তবে প্রকাশ্য কিংবা সদস্য হয়ে দলে নয়। আল আরাফা ইসলামি ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের সদস্যের দায়িত্ব সহ তিনি তাহাফ্ফুজে খতমে নুবুওয়ত, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি. হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য অনেক সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠনের সহিত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশের পিছনে তিনি অনেক শ্রম ও মেধা দিয়েছেন।

 

প্রত্যেক মানুষ বেঁচে থাকে মূলত আল্লাহর মেহেবানীতে তাঁর কর্মে। মহান আল্লাহর কাছে আমরা দোয়া করি তিনি যেনো মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী (র.)-কে বরকত ও রহমদ দিয়ে মালামাল করে দেন এবং জান্নাতের উঁচু দরজা দান করেন। মাওলানা আব্দুল বাসিত বরকতপুরী (র.)-র জানাযায় প্রচুর মানুষ হয়েছে। যদিও এই মানুষ হওয়ার বিষয়টি বেহেস্তি কিংবা দোজখি হওয়ার সাথে সম্পর্কিত নয়। তবে তা দিয়ে প্রমাণিত হয় তিনি যে মাটি আর মানুষের সাথে সম্পর্কিত একজন মানুষ ছিলেন, তিনি যে মানুষের জন্য কিছু করে মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।