jagannathpurpotrika-latest news

আজ, ,

সর্বশেষ সংবাদ

নিজেকে ধৈর্যশীল বানানোর মাস রমজান

মওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খান, অনুবাদ: মহিউদ্দিন মণ্ডল

 

রোজার মাস হলো ‘ধৈর্য ধারণ’ প্রশিক্ষণের মাস, এবং ধৈর্য হলো সেই সর্বোচ্চ মানবিক গুণ, যার মধ্যে এই দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত সাফল্যের রহস্য গোপন রয়েছে। হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থে সালমান ফারসি (রা.)-এর রমজান সম্পর্কিত একটি বর্ণনা বর্ণিত হয়েছে। মুহাদ্দিস আল বাইহাকি (৯৯৪-১০৬৬ হিজরি) এই বর্ণনাকে নিম্নরূপে বর্ণনা করেছেন: ইসলামের নবী (স.) শাবানের শেষে একটি খুতবা দিয়েছিলেন। তাতে তিনি রমজান মাসের উল্লেখ করে বলেছিলেন,  এটা  ধৈর্যের মাস এবং ধৈর্যের পুরস্কার জান্নাত (শু’বুল ইমান, হাদিস নং ৩৩৩৬)। নবী (স.) রমজানকে কেন ধৈর্যের মাস বলেছিলেন? এর কারণ ধর্মের প্রথম জিনিস হলো ঈমান। ঈমান কী? ঈমান হলো অদেখা বাস্তবতার আবিষ্কার। মানুষ নিজেকে বাহ্যিক সুবিধাগুলি এবং বস্তুগত আনন্দ থেকে যখন উর্ধ্বে উন্নীত করে, তারপরে সে অভ্যন্তরীণ গভীরতা উপলব্ধি করে। এটি একটি ধৈর্যের আমল। এই ধৈর্যের আমল ব্যতিরেকে কেউ ঈমানের সর্বোচ্চ জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। এই বিশ্বে মানুষ কেবল সহিষ্ণুতার মাধ্যমেই মানবিক বোধ লাভ করে।

 

ঈমানদারকে ইসলামি নৈতিকতা সহকারে মানুষের মধ্যে বসবাস করা প্রয়োজন। এখানে আবার, ধৈর্য প্রয়োজন। এটি এমন এক পৃথিবী যেখানে অন্যের তরফ থেকে বার বার নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়। এ জাতীয় পরিস্থিতিতে জনগণের সাথে ইসলামি নৈতিকতার বিষয়টি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তিই করতে পারবে যে জনগণের বাড়াবাড়ি সহ্য করে। ইসলামি নৈতিকতা একতরফা ভালো আচরণের নাম, এবং ধৈর্য ছাড়া কারও পক্ষে একতরফা ভালো আচরণ করা সম্ভব নয়।

মুমিন একজন দাঈ (দীনের প্রচারক)। মুমিনের দায়িত্ব হলো ধর্মের বার্তা আল্লাহ্‌র অন্যান্য বান্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দাওয়াতের এই কাজটি ধৈর্য ছাড়া করা যায় না।

দা’ওয়াহ (ধর্ম প্রচার) প্রক্রিয়াটির জন্য দাঈ এবং আমন্ত্রনকারীদের মধ্যে একটি  সহনশীলতার পরিবেশ থাকা দরকার।

মাদ’উ (যাকে দীনের দাওয়াত দেওয়া হয়) ব্যক্তির কাছে এই জাতীয় পরিবেশ তৈরি করার আশা করা যায় না। সুতরাং, মাদ’উ ব্যক্তির তিক্ততা উপেক্ষা করার জন্য আহ্বানকারীকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে যাতে দাওয়াতের পরিবেশটি খারাপ না হয় এবং তিক্ততা উপেক্ষা করার বিষয়টি কেবল তখনই সম্ভব যখন দাঈ ধৈর্য ধরার জন্য প্রস্তুত থাকে। রোজা সেই ধৈর্যের প্রশিক্ষণ এবং ধৈর্য সমস্ত সাফল্যের উৎস।

রোজা ত্যাগের আমল এবং ত্যাগের আমল সবথেকে বড় আমল। একটি হাদিস রোজার এই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যটি বর্ণনা করেছে:  হজরত আবু হুরায়রাহ (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের প্রতিটি কাজের নেকি দশগুণ থেকে বাড়িয়ে সাতশগুণ করা হয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন, ‘তবে রোজার বিষয়টি আলাদা, রোজা আমার জন্য, এবং আমি এর পুরস্কার দেব। বান্দা আমার জন্য তার ইচ্ছা এবং তার খাবার ত্যাগ করে।’

রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে, একটি হলো ইফতার করার আনন্দ এবং অন্যটি হলো নিজের প্রভুর সাথে সাক্ষাতের আনন্দ। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭৪৯২, মুসলিম, হাদিস নং ১১৫১)।

রোজা অন্যান্য এবাদতের থেকে আলাদা এক এবাদত। রোজার সময় একজন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার বৈধ ইচ্ছা এবং তার বৈধ খাবার ত্যাগ করে। রোজাদার ব্যক্তি রোজা রেখে নিজের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যদি নিজেকে অতি প্রয়োজনীয় ও জায়েজ জিনিস থেকে আলাদা করতে হয় তবে সে তা করতে দ্বিধা করবে না। এটিই রোজার বিশেষ বৈশিষ্ট্য যার ভিত্তিতে এটিকে একটি বিশেষ পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে।

আজকের বিশ্বে ন্যায়ের উপর থাকার জন্য একজন ব্যক্তির পক্ষে ঠিক এবং বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য করাই যথেষ্ট নয়। পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে কখনও কখনও নিষেধাজ্ঞার তালিকা আরও বিস্তৃত হয়। কখনও কখনও এমনও প্রয়োজন হয় যে, সে খাওয়া-দাওয়া ভুলে যায় এবং তার দায়িত্ব পালন করে।  তার করার ইচ্ছা থাকলেও তা না করে, বলার জন্য কথা থাকলেও না বলে, এবং পা বাড়িয়েও যেন না চলে, এমনকি যদি সে কোনো কাজ সঠিক বলে মনে করে, তবু সে পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে।

রোজা রাখা এই ত্যাগেরই অনুশীলন। কখনও কখনও এই পৃথিবীতে, এমনকি কোনো বৈধ জিনিস কোনো ব্যক্তির জন্য অবৈধ হয়ে যায়, এমনকি একটি পছন্দসই জিনিসও অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে যায়। এটাই ঈমানের সর্বোচ্চ স্তর। যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং এই উচ্চ স্তরের ঈমান অর্জন করে তাদের জন্য আল্লাহর নিকটে এমন মহাপুরস্কার রয়েছে, যা মানুষের ধারণারও অতীত।