jagannathpurpotrika-latest news

আজ, ,

সর্বশেষ সংবাদ
«» সরকার দেশকে একটি পুলিশী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে : মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক «» সবার জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী «» সুনামগঞ্জ- জগন্নাথপুর সড়কে নির্মাণকালেই ভেঙে পড়ল ১৫ কোটি টাকার সেতুর ৫ টি গার্ডার «» যুবসমাজকে কোরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়নের আহ্বান ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর «» জগন্নাথপুরে সাধারণ পাঠাগার সৈয়দপুরের নতুন কমিটি ঘোষণা «» অমর একুশে ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ : ভাষা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতি «» কমলগঞ্জে মদসহ নারী আটক «» আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে বিগত একশত বছরেও হয়নি- এমএ মান্নান «» জগন্নাথপুরে গ্রেফতার-৩ «» এ পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে সাড়ে ১৮ লাখ মানুষকে



এরদোগানের কেরামতি আধুনিক তুরস্ক ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে ইসলামের পথে : মুফতি ওযায়ের আমীন

কামাল পাশা ১৯২৪ সালে যখন খেলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস করে ইসলামকে চিরতরে তুরস্ক থেকে নিশ্চিহ্ন করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল। তখনই তুরস্কের ভাগ্যাকাশে উদিত হয় ইসলাম পূনর্জাগড়নের নতুন সুর্য্য শায়খ বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসী। যিনি ধর্মনিরপেক্ষতার মহাপ্রলয় ঠেকানোর জন্য ইস্পাত কঠিন পর্বতময় মনোবল নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন ময়দানে। যিনি ধর্মদ্রোহীতার ঘন কুয়াশার যবনিকাপাত করে উন্মেষ ঘটান ইসলামী জাগড়নের নব সুর্য্যোদয়। তিনি পাহাড় থেকে পাহাড়ে ইসলাম সাথে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন অকুতোভয় সৈনিকের মতো। তিনি অমর তাফসীর ‘রিসালায়ে নূর’ রচনার মাধ্যমে বিপ্লবের পয়গাম ছড়িয়ে দেন তুরস্কের আকাশে বাতাশে। গ্রামের পাহাড়ে বসে লেখা তাফসীর নাড়িয়ে দিচ্ছিল আঙ্কারার রাজপ্রাসাদ। এই মহান পুরুষের রুহানী সন্তানদের নিরবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক আন্দোলনের ফসল আজকের এ তুরস্ক।

 

৬০ এর দশক থেকে বারংবার সেই চেষ্টা, দমন পিড়ন, ক্যু, ফাঁসি, গণহত্যা, জেল, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত ইত্যাদির মাধ্যমে ‘আতাতুর্কে’র প্রেতাত্মাদের সাথে বিপ্লবীদের সংগ্রাম চলছিল।

 

৭০ এর দশকে তুর্কিদের আরেক নেতা, অবিসংবাদিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব নাজিমুদ্দীন এরবাকান শুরু করেন মিল্লি গুরুশ বা ন্যাশনাল ভিশন আন্দোলন। এরদোগান, গুল, দাউতোগলুসহ বর্তমানের অধিকাংশ ইসলামী নেতা নুরসী ও এরবাকানের ভাবশিষ্য।

 

এরদোগানের উত্থান ও অগ্রযাত্রা: ১৯৯৭ সালে যখন এরবাকানের নির্বাচিত ইসলামপন্থী সরকারকে মাত্র ৮ মাসের মাথায় ক্যু করে উৎখাত করা হলো তখন ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র এবং তুখোড় তরুণ ইসলামী নেতা রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ও আবদুল্লাহ গুল একটি আপাত মধ্যমপন্থী ধারার রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করলেন। দলের নাম আদালেত ওয়া কালকিনমা পার্টি। ইংরেজিতে- জাস্টিস এন্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি। যার সংক্ষিপ্ত রূপ একে পার্টি। একদিকে এই দলের ঘোষিত মূলনীতি ছিল ইসলাম নিরপেক্ষ। অন্যদিকে মূল নেতৃত্ব ছিল ইসলামী সংগঠন ও প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞ কিছু ব্যক্তিত্ব। এজন্যই আমরা দেখতে পাই- হুলিয়া মাথায় নিয়ে হাই স্ট্যাটাসের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিলাসী চাকরি ছেড়ে এই নতুন বিনির্মাণে এক কাপড়ে চলে আসতে পেরেছিলেন আবদুল্লাহ গুল এবং আরো অনেকে।

 

২০০২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সব ধরনের স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে নিরংকুশভাবে জয়লাভ করে চলেছে এই একে পার্টি।

 

এরদোয়ানদের কি আসলে কোনো ইসলামী এজেন্ডা আছে? অনেকে মনে করেন এরদোয়ানের কোনো ইসলামী এজেন্ডা নেই। কেউ কেউ মনে করেন এরদোয়ান পশ্চিমাদের এজেন্ট। একজন মানুষ আসলে কী বিশ্বাস করেন সেটা অন্তরের ভেতরে ঢুকে বোঝা সম্ভব নয়। বরং মানুষ বাঁচে তার কাজের মধ্য দিয়ে। বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।

 

এরদোয়ান গত ১৫ বছরে ব্যক্তি, সমাজ, সাংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক জীবনে কী ধরনের সংস্কার নিয়ে এসেছেন- গভীরভাবে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করলেই এরদোগানের প্রকৃত মিশন ও ভিশন সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

 

ইসলামাইজেসনে ইন্সেন্টিভ: ইমাম হাতিপ স্কুলের (তুর্কি মাদরাসা সিস্টেম, এরদোয়ান নিজেও এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন) প্রত্যেক ছাত্র ইদানিং একটা করে ট্যাবলেট কম্পিউটার পায়। সাধারণের তুলনায় এটা অতিরিক্ত একটা সুবিধা। তাদের শিক্ষাদান হয় ডিজিটাল পদ্ধতিতে, অথচ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বড় বড় পাঠ্যবই থেকে বেরুতে পারেনি। ইমাম হাতিপ স্কুলের ক্লাসরুমের ডেকগুলোও ডিজিটাল, আর বাস ভাড়া অন্য স্কুলের তুলনায় অর্ধেক। সাম্প্রতিক একটা নতুন আইনে ইমাম হাতিপ স্কুল থেকে পাশ করা ছেলেমেয়ের জন্য যে কোনো বিষয়ে উচ্চতর পড়াশুনা ও সরকারী চাকরি করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। ইমাম হাতিপ স্কুলের সংখ্যা প্রায় ৯০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

২০১২ সাল থেকে স্কুলগুলোতে ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনেকেই মনে করেন এসব নতুন শিক্ষানীতির প্রভাব পড়বে বছর বিশ পরে নতুন প্রজন্মের উপর। কারণ এসব ইসলামী শিক্ষা আসলে একটা প্রচন্ড শক্তিশালী আহবান। হৃদয় মনে এর প্রভাব পরারই কথা।

 

সম্প্রতি এরদোয়ান বলেছেন, হাইস্কুলে আরবি হরফ ও আরবি ফার্সি শব্দ মিশ্রিত উসমানীয় তুর্কি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। মুস্তাফা কামালের আরবি হরফ ব্যান করাকে তিনি গর্দানের শাহরগ কেটে ফেলার সাথে তুলনা করে বলেছেন, “ইতিহাস লেখা আছে পূর্বপুরুষের সমাধি পাথরে, তোমরা তরুণরা যদি তা পড়তেই না জানো, এর চাইতে বড় দুর্বলতা আর কোনটা হতে পারে?”

 

ইসলামিক ভ্রাতৃত্বোন্নয়নে পররাষ্ট্র নীতি: একে পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্পষ্টতই একটা মুসলিম স্বার্থঘেঁষা অ্যাকটিভ ফরেন পলিসি দেখা যাচ্ছে। এরদোয়ান নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের এক প্রোগ্রামে বলেছিলেন, ফিলিস্তিন ইস্যু, ইরাক ও সিরিয়ার সংকট, ক্রাইমিয়া বা বলকান- এসব কিছুর জন্মই হয়েছে উসমানী খেলাফত পতনের পর। তুর্কি এ সবকিছুই ভাল বুঝে, অনুধাবন ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা রাখে। কারণ এ অঞ্চলের ইতিহাস হচ্ছে আমাদের যৌথ ইতিহাস।

 

ফিলিস্তিনের গাজায় ফ্রিডম ফ্লোটিলা পাঠানো থেকে সোমালিয়া বা আরাকানের মত দূরবর্তী অঞ্চলে ত্রাণ দেওয়া, আফ্রিকায় ২৭ টা নতুন অ্যাম্বেসি খোলা, বাশার আল আসাদের স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে চলমান গণপ্রতিরোধকে সব ধরনের সাহায্য দেওয়া এবং সিরিয়ান রিফিউজিদের জন্য সবচাইতে বড় শরনার্থী শিবির খোলা, কিংবা ইখওয়ানুল মুসলিমুনের নির্বাসিত নেতৃবৃন্দকে জায়গা দেওয়া আর সিসির সামরিক জান্তার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা, অথবা বাংলাদেশে ইসলামিক নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে পরিচালিত সরকারি ফাঁসি উৎসবের ব্যাপারে আবদুল্লাহ গুলের তরফে উদ্বেগ জানিয়ে চিঠি লেখা– এসব কিছুকে শুধু একটা তত্ত্ব দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়– ইসলামী ভ্রাতৃত্বের পররাষ্ট্রনীতি। এটা এখন ওপেন সিক্রেট যে, উসমানী খেলাফতের আদলেই চলছে তুর্কির ফরেন পলিসি। সেজন্য একাডেমিক মহলে এরদোয়ান, গুল ও দাউতোগলুদের বলা হয়ে থাকে নিউ অটোমান বা নয়া উসমানী।

 

হিজাব, নারী স্বাধীনতা ও নারী অধিকার: কামালের ইউরোপীয়করণ প্রজেক্টের পর থেকে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা হিজাব পড়তে পারত না। এরদোয়ানের সরকার বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুলের উপর থেকে দুই ধাপে এই ব্যান তুলে দিয়েছে। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপর থেকেও এই ব্যান তুলে নেওয়া হয়েছে। এর আগে সেক্যুলার এলিটরা ইসলামপন্থী অথবা পরহেযগারদের উত্থান রোধে এইসব নানান ফন্দি-ফিকির তৈরি করে রেখেছিল।

 

এরদোয়ান একদিকে মেয়েদের ব্যক্তিস্বাধীনতা অর্থাৎ হিজাব গ্রহণ বা বর্জনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করছেন, অন্যদিকে মেয়েদের অনুরোধ করছেন পরহেযগারী অবলম্বন করতে। তিনি নারীবাদীদের এক বক্তৃতায় বলেছেন, নারী ও পুরুষের ফিতরাত (জন্মগত স্বকীয়তা) আলাদা এবং কখনও তা সমান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণীদের তিনি নসীহত করেছেন, তাঁরা যেন বিয়ের সময় পাত্র পছন্দে বেশি খুঁতখুঁতে না হয়। এদিকে প্রধানমন্ত্রী দাউতোগলু বলেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব যে নারী পুরুষ একাকার করার চেষ্টা করছে সেটার সাইড ইফেক্ট হচ্ছে হতাশা এবং আত্মহত্যার হার বৃদ্ধি। অথচ এইসব দেশের জিডিপি পৃথিবীর সেরা। তিনি বলেছেন, আমরা কখনও মেনে নেব না যে, একজন পুরুষ যেসব পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে একজন গর্ভবতী মহিলাকেও বেঁচে থাকার জন্য সেসব কাজই করতে হবে। কারণ সন্তান জন্ম দেওয়া হচ্ছে একটা আসমানী কাজ যার উপর নির্ভর করে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব। আর এটা যিনি করবেন সেই মা’র অধিকার আছে পরিশ্রম থেকে মুক্তির।” ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে মেয়েদের অনুরোধ করেছেন, তাঁরা যেন নৈতিকতা ও পরহেজগারীর পথই বেছে নেন, পাবলিক ডিসপ্লে হয়ে লাস্যময়ী ‘বস্তু’তে পরিণত না হন।

 

কট্টরপন্থী নয়, উদার নৈতিকতা সম্পন্ন জেনারেশন: এরদোয়ানের শত্রুরা মনে করেন, এরদোয়ান তুর্কিকে বিপ্লবোত্তর ইরান বা তালেবানের আফগানে পরিণত করেননি ঠিকই, তবে কামাল পাশার তুর্কির খোলনলচা অনেকটাই বদলে দিয়েছেন। মুস্তাফা কামাল বলতেন, আমরা একদল সেক্যুলার দেশপ্রেমিক চাই। আর এরদোয়ান প্রায়শই বলে থাকেন, আমরা একটা পরহেজগার প্রজন্ম গড়ে তুলছি এবং একটা ‘নতুন তুর্কি’ আমাদের গন্তব্য। এরদোয়ানের সমালোচকরা অনেকেই মনে করেন ইসলাম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না ঠিকই; কিন্তু পলিসি নির্ধারণের মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় একে পার্টির এক ধরনের রক্ষণশীল ঝোঁক, সামাজিক বিষয়াদিতে সরকারী মদদে নৈতিকতা ছড়ানোর চেষ্টা স্পষ্ট।

 

কোনো সিনেমা বা মঞ্চ নাটকে যদি এমন ডায়ালগ থাকে যে, “I want to sleep with you.” খুব সম্ভবত সেই নাটক/সিনেমা তুর্কিতে আর আলোর মুখ দেখবে না। যেসব সরকারী থিয়েটার বা অপেরা হাউজ সরকারী ফান্ড পায় সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ এখন এরদোয়ানের ‘পরহেজগার জেনারেশনে’র হাতে। কাজেই এর একটা পরোক্ষা প্রভাব প্রোডাকশনের উপর পড়েছে।

 

মদের উপর বিধিনিষেধ আরোপ: এরদোয়ান সরকার মদের উপর সরকার কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যেকোনো প্রকারের মদের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ এবং গভীর রাতে এর বেচাবিক্রিও নিষিদ্ধ। এখন আর সব জায়গায় মদ বেচাও যাবে না। সরকারী একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এসব কাজের কারণ ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, আমরা কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেগুলেশন যথাযথভাবে মেনে চলার চেষ্টা করছি। এখানেও ইসলামী ঝান্ডা না উড়ানোর সচেতন ও কৌশলী ভূমিকা সহজেই চোখে পড়ে।

 

বর্তমানে তুর্কির রাস্তায় হাঁটলে আপনার চোখে পড়বে অনেক বেশি হিজাব; মসজিদের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। ইসলামী দাওয়াহ আগের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।

 

আদর্শ তুর্কির সংজ্ঞা চেঞ্জ: বিখ্যাত তুর্কি সাংবাদিক মুস্তফা আকিউল বলেন, আগের দিনে একজন আদর্শ তুর্কি ছিলেন তিনিই যিনি পরহেযগার নন, আর এখন এর ঠিক উলটা। আপনি যদি মদখোর হন, একেপির রাজ্যে আপনার খবর আছে, এখানে আপনার জায়গা খুঁজে নিতে কষ্ট করতে হবে। এই লোকগুলা আসলে ধীরে ধীরে পুরো ব্যাপারটার উপরের দিক নিচে আর নিচের দিক উপরে এনে উলটে-পালটে দিচ্ছে। এখন শুরুর প্রশ্নে ফিরে যাই, এরদোয়ানের কি আসলে কোনো ইসলামী এজেন্ডা আছে? বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।

 

শক্তিশালী অর্থনীতির গোড়াপত্তন: কীভাবে এসব সম্ভব হলো? এরদোয়ানরা ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরগুলোতে কিছু ইন্সটিটিউশান গড়ে তোলায় গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন। জোর-জবরদস্তি করে ক্ষমতায় থাকা পূর্বতন সরকারের লোকগুলো ভুল অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে তুর্কি অর্থনীতি এতটা অগ্রসর হতে পারেনি। এরদোয়ানদের সাথে যারা একে পার্টি গড়ে তোলায় এগিয়ে এসেছিলেন এদের অনেকেই এসেছিলেন মূলত অর্থনৈতিক দর্শনে মিল থাকার কারণে, ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কারণে নয়। এরদোয়ানের পার্টি যে অর্থনৈতিক কর্মসূচি হাজির করেছিল সেটা ছিল উদারনৈতিক পুঁজিতান্ত্রিক বিকাশের জন্য খুবই উপযোগী। এছাড়া একটা ব্যবসায়ী প্রজন্ম এরদোয়ানের কমরেড হয়েছেন যাদের বলা হয়ে থাকে আনাতোলিয়ান টাইগার্স। এরা খুব ঝানু ব্যবসায়ী আর ব্যক্তিগতভাবে পরহেযগার।

 

অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবসময় আইনের শাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একে পার্টি প্রশাসনের উঁচু স্তরে অন্তত একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন যাতে ব্যবসায়ীদের মনে এই আশ্বাস জন্মেছিল যে, এখানে ব্যবসা করলে চাঁদাবাজি আর লাল ফিতার দৌরাত্ম্য সহ্য করতে হবে না। মাত্র ৫-৮ বছরের ব্যবধানে তুর্কি অর্থনীতি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, অবকাঠামো নির্মাণ, রপ্তানী বহুগুণ বৃদ্ধির এমন সব শক্তিশালী চমক হাজির করা শুরু করে, যেগুলো ছিল যেকোনো অর্থনীতিবিদের জন্য ঈর্ষণীয় একটা সাফল্যের রাজতোরণ। জিডিপি অনেক বেড়ে গেল।

 

তুরস্কে ২০০৫ সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৬ হাজার ডলারের একটু বেশি আর ২০১৩ সালে এটা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ডলারের উপরে। মূলত অর্থনৈতিক শক্তিই হচ্ছে এরদোয়ানদের পায়ের নিচের সেই মাটি যার উপরে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে এরদোয়ান তাঁর অন্য এজেন্ডা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

ব্যাপকভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের রূপ: তুর্কি ইসলামপন্থীদের একটা বড় অংশ হচ্ছে ১৯৬০-৯০ এর দশকে গ্রাম থেকে শহরে আসা ইমিগ্রেন্ট জনশক্তি। এই সময়টা তুর্কির নগরায়নের সময়। বলাই বাহুল্য, রাজার নীতি নিয়ন্ত্রণ করে শহর। শহুরে মডার্নিটির ইট পাথরে এই জনগোষ্ঠী গড়হাজির থাকতেন আর ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিলেন আনাতোলিয়ান ইসলামের সুগন্ধ। রাজনীতি বা সংস্কৃতি, শিক্ষা বা ব্যবসা এসব কিছুতেই তাঁরা খুঁজেছেন একই ফ্লেভারের কোনো গ্রুপ। এই গ্রুপ একদিকে যেমন ইসলামপন্থীদেরকে রাজনৈতিক সমর্থন দিয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে ওয়াকফ ও দান করার আনাতোলিয়ান সংস্কৃতিকে পুরোপুরি জারি রেখেছে। এর ফলে সামাজিক সেবার এক বিরাট নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এসব নেটওয়ার্কের অনেকগুলোই বিভিন্ন সুফী খানকা দ্বারা উদ্বুদ্ধ বা জড়িত। কিন্তু হাল আমলের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এসব সামাজিক সেবার নেটওয়ার্ক সবসময় ইসলামপন্থী আন্দোলনের সহায়ক শক্তি হিসাবেই কাজ করে গেছে। অন্তত জনগণের চোখে ইসলামপন্থী আন্দোলন আর এইসব সামাজিক কর্মসূচি, যা আসলে একটা সমান্তরাল রাষ্ট্রের মতই, সকল বিপদে-আপদে মানুষের কাজে এসেছে, এদের মধ্যে কোনো ফারাক চোখে পড়েনি। এসব নেটওয়ার্কের রয়েছে হাজারো স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, এনজিও, রাইটার্স গিল্ড, বহু পত্রিকা, বেশ কিছু টিভি চ্যানেল আর প্রকাশনা সংস্থা। এই পুরা কর্মযজ্ঞ ও যন্ত্রই ইসলামীকরণের ইঞ্জিন হিসাবে কাজ করেছে। সমাজের ইসলামীকরণ আগে হয়েছে নিচ থেকে উপরে (bottom up), আর সরকারযন্ত্র উপর থেকে নিচে এই কাজের হালটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। একদিকে সামরিক বাহিনী ও সেক্যুলার এলিটের তৈরি ডিপ স্টেইট প্রতি দশকে ক্যু করে রাজনৈতিকভাবে ইসলামপন্থী আন্দোলনকে বনসাই করে রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে ইসলামপন্থী গ্রুপগুলো সমাজের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়াকে বিকেন্দ্রীকরণ করে দিয়েছে। সব ডিম এক ঝুঁড়িতে না রেখে পোর্টফলিও ডাইভার্সিফাই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। সময়মত সবকিছু একই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের দিকে ‘ক্লিক’ করেছে। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে অসম্ভব মেধাবী, কৌশলী ও দুনিয়াদারীর বুঝওয়ালা একদল অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতৃত্বের হাতে। স্মরণ করা যেতে পারে, এই লোকগুলো কীভাবে নিয়মিত ইউরোপিয়ান, ইজরাইলী বা আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটদের নাকানিচুবানি খাওয়ান।

 

ইইউ অন্তর্ভুক্তির ঘোষণা ও ইউটার্ন: সেনা ক্যু এর চির অবসান তুর্কির ইউরোপমুখী অভিগমন একদিকে যেমন বহু খারাপ বিষয়ের আমদানি করেছে, অন্যদিকে কিছু ভাল ইন্সটিটিউশন বয়ে এনেছে। এর একটা হচ্ছে একটা উদারনৈতিক স্পেস তৈরি করা। এই স্পেস একটা স্বাস্থ্যবান বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ হাজির করেছে। এই পরিবেশ এক রকমের বুদ্ধিবৃত্তিক সহনশীলতা জন্ম দিয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে একদিকে পশ্চিমাকরণ হচ্ছে আর অন্যের চিন্তা গ্রহণ করা বা নিদেনপক্ষে অন্যের মত শোনার মত সহনশীলতা শূন্যের দিকে যাচ্ছে। এরদোয়ান ইইউ’তে তুর্কির একীভূতকরণের যে মুলাটা ঝুলিয়েছিলেন, তা ছিল এই সিভিল স্পেস ব্যবহার করার স্বার্থে। এই এক মুলা ঝুলিয়ে রাজনীতি থেকে সেক্যুলার-মিলিটারি আঁতাতের ‘ডিপ স্টেট’কে একদম ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। কেননা ইউরোপীয় স্ট্যান্ডার্ড দাবি করে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং কিছু অনস্বীকার্য সিভিল রাইটস। মিলিটারি ছিল সেক্ষেত্রে একটা বাঁধা। ইইউ’তে যাওয়ার কথা বলে সেগুলো সহজে দূর করা সম্ভব হয়েছে। জুডিশিয়াল রিফর্মও হয়েছে একই সাথে। এর আগে জুডিশিয়ারির কাজই ছিল অনুবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে দেখা, কোথাও সেক্যুলারিজম এতটুকু ‘দূষিত’ হয়ে গেল কিনা। পরে যখন ইইউ তুর্কিকে নিতে অনাগ্রহ দেখালো, ততদিনে রিফর্ম যা হবার হয়ে গেছে এবং সেক্যুলার এলিট ডিপ স্টেট পরিণত হয়েছে এক দন্তনখবিহীন বাঘে। এসব কিছুর পর দাউতোগলু আল জাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে যখন বলেছিলেন যে, “এ বছর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে বেকারত্বের সংখ্যা ছিল এক মিলিয়ন আর তুর্কি এ বছর নতুন চাকরি তৈরি করেছে এক মিলিয়ন। তুর্কি যদি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকত তাহলে ইইউ’তে কোনো বেকারত্বই থাকত না” তখন ব্যাপারটা যথেষ্ট কৌতুককর হয়েছিল সন্দেহ নাই। এখন অনেকে প্রশ্ন তোলেন ইইউ’তে ঢোকার কোনো ইচ্ছা আদৌ আক পার্টির ছিল কিনা। নাকি এটা ছিল স্রেফ নিজেদের এজেন্ডা হাসিল করার একটা উপায় এবং ব্যবহার শেষে এরদোয়ানের দল সেটাকে টিস্যু পেপারের মত ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।

 

বর্তমানে একটা নূন্যতম স্তর পর্যন্ত সার্বজনীন শিক্ষা চালু হয়েছে। বর্তমানে তুর্কি রিপোর্টে স্বাক্ষরতার হার ৯৮.৭৮%। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এটা ৫৮% এর কাছাকাছি। শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আদর্শবাদী কোনো উদ্দেশ্যের দিকে ধাবিত করা যত সহজ অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সেটা ততটা সহজ নয়। লেখক: মুহতামিম ও শাইখুল হাদিস, জামেয়া রাহমানিয়া দারুল ইসলাম। ইমাম ও খতিব, যাত্রাবাড়ী বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদ ঢাকা।