jagannathpurpotrika-latest news

আজ, ,

সর্বশেষ সংবাদ
«» ওসমানীনগরে নিজ মান্দারুকার মাঠে শেখ রাসেল ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় কিং গ্রুপের শুভেচ্ছা «» ছাতকে মেয়র প্রার্থী রাশিদা আহমদ ন্যান্সি’র সমর্থনে নির্বাচনী সভা ও মিছিল «» বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে ৪ মাস, অতঃপর প্রেমিকের পলায়ন «» ছাতক উপজেলা ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দকে অভিনন্দন «» বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৪৫ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা «» দোয়ারাবাজার পান্ডারগাঁও ইউ/পিতে এফবিএস ফোরাম’র নতুন কমিটি ঘোষণা «» জুড়ীতে অসহায়দের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ «» ছাতকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী রাশিদা আহমদ ন্যান্সির নির্বাচনী পথসভা «» দুর্নীতির মহামারী থেকে দেশকে রক্ষার জন্য নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে- ছাত্র মজলিস «» মৌলভীবাজারে নৌকা ডুবিয়ে বিজয়ী ‘বিদ্রোহী’ ফের বহিষ্কার



আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমী রাহ. এর বর্ণাঢ্য জীবন ও সংগ্রাম

–মুফতি ওযায়ের আমীন–

 

তুমুল জনপ্রিয় একজন সফল শিক্ষকের প্রতিকৃতি মাওলানা নুর হোসাইন কাসেম রাহ.। অনবদ্য বর্ণাঢ্য জীবন সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক আল্লামা কাসেমী। তিনি দেওবন্দী মাসলাকের একজন শীর্ষ আলেম। সর্বদা সুন্নাতের অনুসরণ ও আকাবির আসলাফের দেখানো পথে ছিলেন অটল-অবিচল। সাদাসিধে জীবন তার ঐকান্তিক ব্রত। রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীসের খেদমাত আর সমাজে ইলমে দ্বীন পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বদা মগ্ন ছিলেন এ রাহবার।

 

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমী ১৯৪৫ সালের ১০ জানুয়ারী রোজ শুক্রবার বাদ জুমা কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ থানার চড্ডা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি শৈশব থেকেই পড়াশুনার প্রতি অনেক মনোযোগী ছিলেন। বাবা-মায়ের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করেন। তারপর কাশিপুর মাদরাসায় ভর্তি হোন। এখানে মুতাওয়াসসিতাহ পর্যন্ত পড়েন।

 

১৯৬১ সালে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম বরুড়া মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে হেদায়া পর্যন্ত পড়েন। তখন বরুড়া মাদরাসায় মাওলানা তাফাজ্জল হক হবিগঞ্জী রাহ. শিক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর কাছে খুসুসীভাবে এ সময় দরস লাভ করেছেন। এজন্য তিনি তাঁকে উস্তাদের মর্যাদায় দেখেন।

 

দারুল উলুম দেওবন্দে গমন:

 

প্রতিভাবান নবীন কাসেমী ১৯৬৬ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে পাড়ি জমান। কিন্তু ভর্তির নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারায় সাহারানপুর জেলার বেড়ীতাজপুর মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে জালালাইন জামাত পড়েন। তারপর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইলমী পিপাসাকে নিবারণের জন্য ভর্তি হোন দারুল উলুম দেওবন্দে। দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাঁর মেধার স্বাক্ষর প্রতিফলিত হতে থাকে। ধারাবাহিক সফলতা তাঁর পদচুম্বন করতে থাকে।

 

এখানে তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী রহ. এর কাছে বুখারী শরীফ পড়েন। মুরাদাবাদী রহ. এর অত্যান্ত কাছের ও স্নেহভাজন হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ফলে অল্প সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাকমীল জামাত পড়ার পর আরো তিন বছর বিভিন্ন বিষয়ের উপর ডিগ্রি অর্জনে ব্যাপৃত থাকেন। এ সময় তাকমীলে আদব, তাকমীলে মাকুলাত, তাকমীলে উলুমে আলিয়া সমাপ্ত করেন। দারুল উলুম দেওবন্দের কুতুবখানায় যেসব ছাত্রদের সব সময় প্রবেশের ইজাজত ছিলো তিনি তাদের অন্যতম।

 

কর্মজীবনে শিক্ষকতার শুরু ভারতে:

 

দীর্ঘ ২৭ বছর যাবৎ অর্জিত জ্ঞানকে প্রচারের নিমিত্তে তার উস্তাদ মাওলানা আবদুল আহাদ রহ. এর পরামর্শে হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত মুজাফফরনগরে অবস্থিত মুরাদিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে শুরু করেন ইলমে অহীর আলো প্রজ্জলনের কাজ। মুরাদিয়া মাদরাসায় ১ বছর শিক্ষকতা করার পর মাতৃভূমির টানে ১৯৭৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

 

স্বদেশ প্রত্যাবর্তন:

 

১৯৭৬ সালের শেষ দিকে জন্মভূমি ও মাতৃটানে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে এসে সর্বপ্রথম শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার নন্দনসার মুহিউস সুন্নাহ মাদরাসায় শায়খুল হাদীস ও মুহতামিম পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় যোগদান করে চার বছর সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে শিক্ষকতা করেন। এ সময় তিনি অনেক মেহনতী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও দেশদরদী ছাত্র তৈরি করেছিলেন।

 

ফরিদাবাদ মাদরাসায় তিনি দারুল ইকামার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৯৮২ সালে চলে আসেন জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে। এখানে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিরমিজি শরীফের দরস দান করেন। মালিবাগে ৬ বছর শিক্ষকতা করেন।

 

১৯৮৮ সালে জামেয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালে জামিয়া সুবহানিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। এই দুটি মাদরাসার প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আমৃত্যু তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে শায়খুল হাদীস ও মুহতামিমের দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন।

 

কিতাব পাঠদানে অসাধারণ পাণ্ডিত্য:

 

সে সময় যারা তার কাছে পড়েছেন তাদের ভাষ্যমতে, কাসেমী সাহেব হুজুর- সুল্লাম, মায়বুজি, মাকামাতে হারীরী, কাফিয়া- শরহেজামী ও তাফসীরে বায়যাবীর মতো কিতাব প্রায় মুখস্ত পড়াতেন।

 

কোন কোন কিতাব দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার আগে নিজেও হাতে নিতেন না। ছাত্রদের হাতেও নিতে দিতেন না। লেখাপড়া হতো সীনা থেকে সীনায়, আলোকিত হৃদয় আঙ্গিনায়, আর সংরক্ষণ হতো কলম খাতায়।

 

ঈর্ষনীয় পান্ডিত্যের অধিকারী এ মনিষীর যৌবন কালের দরসে যারা বসেছেন তারা অবশ্যই জীবনভর তাকে লালন করবেন তার গুনের আকর্ষণে। মাওলানা কাসেমী প্রতিটা ছাত্রের মেধা রুচিবোধ ও মননশীলতা বুঝে তাকে গড়ার ব্যবস্হা নেন। তাই হুজুরের ছাত্ররা একটু বেশি পরিশ্রমী ও সমাজকর্মী মানসিকতার হয়ে থাকে।

 

 

আধ্যাত্মিক সাধনা: ও বায়আত গ্রহণ:

 

আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রাহ. কিশোর বয়স থেকেই ইবাদাত প্রিয়। ইবাদতের প্রতি তার ঝোঁক বরাবর অবাক করার মতো। জীবন সায়াহ্নে বৃদ্ধ বয়সে হুইল চেয়ার দিয়ে চলাচলকারী এ মানুষটি যেভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে নামাজ আদায় করতেন তা যে কাউকে বিস্মিত করে।

 

লেখাপড়া শেষে তিনি তাসাউফের মেহনত ও আধ্যাত্মিক সাধনায় একান্তভাবে আত্মনিয়োগ করতে শাইখুল হাদীস জাকারীয়া কান্ধলভী রহ. এর স্বান্যিধ্যে চলে যান এবং বায়আত হন। তার সাথে রমজানে ইতেকাফ করেন। তখন তিনি মুরাদিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনা করতেন। তাঁর কাছ থেকে দাওয়াত, দাওয়াতের আজমত ও প্রয়োজনিয়তা এবং আদর্শ সমাজ বিনির্মানে এর প্রভাব ইত্যাদি বিষয়ে গভীর দীক্ষা লাভ করেন।

 

মুফতি মাহমুদ রাহ. থেকে খেলাফত লাভ:

 

শায়খুল হাদীস রহ. এর ইন্তেকালের পর মুফতি মাহমুদ হাসান গাংগুহী রহ. এর সোহবত গ্রহন করেন। মুফতী মাহমুদ হাসান গঙ্গোহী রহ. ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশে আসেন। মালিবাগ জামিয়ায় ইতেকাফ করেন। এয়ারপোর্ট মাদরাসায় অবস্থানকালে তার কাছ থেকেই ১৯৯৫ সালে খেলাফত লাভ করেন।

 

উভয় শায়খের বিরাট প্রভাব হযরতের জীবনে পরিলক্ষিত হয়। আমলে জিন্দেগীতে যেন তিনি হুবুহু তাদেরই প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনে দাওয়াত ও তাবলীগের বিষয়ে যে সীমাহীন ফিকির ও অত্যন্ত দরদ দেখতে পাওয়া যায় তা শায়খেরই প্রভাব।

 

জামানার এই মহান আধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা কাসেমী খেলাফত লাভ করেছেন প্রায় ২৫ বছর পূর্বে। কালক্রমে তিনি বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হন। তার কাছে হাজারো মানুষের মুরীদ হওয়ার চাহিদা এবং অনেক পীড়াপীড়ির পরও তিনি এড়িয়ে যান। কাউকে মুরীদ বানাতে আগ্রহী দেখানো তো অনেক দূরের বিষয়। তবে তার কাছে কেউ মুরীদ হতে এলে তিনি মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর জানেশ্বীন মুফতি ইবরাহীম আফরিকী দা.বা. এর কাছে পাঠিয়ে দেন।

 

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন:

 

১৯৭১ সাল। দারুল উলুম দেওবন্দ বাংলাদেশের আলেম সমাজকে দেশের মহান স্বাধীনতার পক্ষে জোড়ালো ভূমিকা পালন করতে বারবার উৎসাহিত করেছেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের শীর্ষ নেতৃত্ব পরোক্ষভাবে এ দেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন।

 

স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী সে সময়ে দারুল উলুম দেওবন্দের পড়াশোনা করছিলেন। দেওবন্দ থাকাবস্হায় মাওলানা কাসেমী রাহ. স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের ছাত্রদেরকে স্বাধীনতার পক্ষে লড়াই করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন।

 

রাজনৈতিক জীবন:

 

রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবনের অন্যতম একটি দিক ছিলো রাজনীতি। তখনকার সময়ের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদী তিনি রাজনীতির মাধ্যমে সমাধান করতেন। প্রিয় নবীজির সুন্নতের অনুসরণ ও আহাম্মুল ফারাইজ হিসেবে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবও আমৃত্যু রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি ইবাদাত মনে করে রাজনীতি করতেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসূলের সুন্নাত হিসেবে রাজনীতি করতেন।

 

১৯৭৫ সাল থেকেই তিনি জমিয়তের একনিষ্ঠ সক্রিয় কর্মী ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘকাল জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মরহুম মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. এর নেতৃত্বে সকল আন্দোলনে শরীক থাকতেন। ১৯৯০ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন।

 

২০১৫ থেকে আমৃত্যু জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি নিজস্ব মেধা, দক্ষতা ও পরামর্শের মাধ্যমে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে বাংলাদেশে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হন।

 

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম:

 

মাওলানা কাসেমী রাহ. দেশ-জাতি ও জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে অনড় থেকেছেন সবসময়ই। যালিমের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্হান সর্বক্ষেত্রে সর্বত্র ও সারাক্ষণ। আজীবন তিনি যালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের জয়গান উচ্চকিত করেছেন। তিনি মজলুমের সাহসী কন্ঠের প্রতিচ্ছবি। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সর্বদা তিনি ছিলেন অনড়, দৃঢ় দুর্বার ও উদার। কখনও তাঁকে স্বীয় জীবনের পরোয়া কিংবা ছেলে মেয়েদের রুটি রুজির চিন্তা হক্ব বলা ও করা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। তিনি আমৃত্যু সংগ্রাম মুখর জীবনযাপন করেন।

 

তুমুল জনপ্রিয় আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সংগ্রামী মহাসচিব এর দায়িত্ব পালন করেন। ঐতিহাসিক ২০১৩ সালে নাস্তিক বিরোধী আন্দোলনের ফলে শাহবাগ থেকে নাস্তিকদের পতন ঘটে। শাপলা চত্ত্বরে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ মহাসমাবেশ আল্লামা কাসেমী রাহ. এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।

 

১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশের আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন খতমে নবুওয়াত আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন। এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

 

বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন বিরোধী আন্দোলন, ২০০১ সালে নারী অধিকারের নামে কুরআন বিরোধী আইন রহিত করার জন্য আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রক্ষার দাবীতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখতে বাধ্য হয়।

 

তিনি অত্যন্ত সূচারুরুপে সকল দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার পাশাপাশি প্রচুর শ্রম ও মেধা খাটিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ইস্যুতে চমৎকারভাবে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি যেসব বিষয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক দাবীর ফলে সরকার তার প্রতিটি দাবীকে মানতে বাধ্য হয়েছে।

 

বুখারী শরীফের দরসদান:

 

আল কোরআনের পর বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধতম গ্রন্থ পবিত্র বুখারী শরীফ। শায়খুল হাদিস আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী ১৯৮৮ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু দীর্ঘ তিনযুগ ধরে বুখারীর দরস প্রদান করেছেন। তার কাছ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজারেরও বেশি ছাত্র বুখারীর দরস লাভ করেছেন। বাংলাদেশের প্রথিতযশা এ আলেমের কাছে বিদেশ থেকে অনেক মাদরাসার শায়খুল হাদীস সনদ প্রাপ্তির লক্ষে বারিধারার কুঁড়েঘরে নিয়মিত আসতেন।

 

বেদখল বারিধারা মাদরাসা:

 

কাসেমী সাহেব ১৯৯৮ সালের রমজানে ইতেকাফের উদ্দেশ্যে দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। ইতেকাফ সমাপ্ত করে ঢাকায় এসে দেখেন বারিধারা মাদরাসা বেদখল হয়ে গেছে। তিনি সকল শিক্ষককে অনুরোধ করলেন বারিধারায় নিয়মিত সবক পড়াতে। কিন্তু ছাত্র শিক্ষক হুজুরকে ছাড়া থাকবেন না বলে জানালেন। তারা হুজুরের সান্নিধ্যেই থাকতে চান। হুজুর যেখানেই থাকবেন তারা হুজুরের সাথেই থাকবেন। আমি তখন মালিবাগ জামিয়ায় শরহে বেকায়া জামাতের পড়ি। মালিবাগ থেকে প্রতিনিয়ত এসব সংবাদ জানতাম, আর অনুপ্রাণিত হতাম।

 

অনিশ্চিত গন্তব্যে বন্ধুর পথযাত্রা:

 

যত কষ্টই হোক তবুও শুরু হলো এক অচেনা পথে জীবন চলা। যার পরতে পরতে শুধুই কষ্ট। কিছুদিন কোন নির্মানাধীন বাড়িতে। কিছুদিন খোলা ময়দানে, কিছুদিন জঙ্গলবেষ্টিত আমতলায়। কিছুদিন তালতলায়।

 

খাবার নেই, পানি নেই। নেই পড়ার কিতাব। তবুও দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত ৩৫০ জন ছাত্র নিয়ে নিদারুণ কষ্টকর এক জীবন। এমন প্রায়ই হয়েছে যে ১০/১৫ দিন একবেলাও বোর্ডিংয়ের চুলা জ্বলেনি। তবুও কারো মনে কোন কষ্ট নেই। নতুন ঠিকানায় নিয়মিতই এমনটি হতো।

 

একদিন বাদ ফজর কাসেমি সাহেব হুজুর ছাত্রদেরকে নিয়ে খুব কাঁদলেন। আর সকল ছাত্রকে বলে দিলেন তোমরা চাইলে বাড়ি চলে যেতে পার। থাকার জায়গা এবং বোর্ডিংয়ের খাবারের ব্যবস্হা হলে তোমাদের জানানো হবে। তখন তোমরা চলে এসো। তোমাদের কারো দাখেলা কাটা যাবে না। সকল ছাত্র শিক্ষকের কান্নায় মসজিদ চত্ত্বর ভারী হয়ে উঠলো। এমন করুণ দৃশ্য জীবনে দেখতে পারা সৌভাগ্যের বিষয়?

 

ছাত্রদের কেউ কেউ ১০/১৫ টাকায় দিন পার করতো। ছাত্ররা ২ টাকা দিয়ে সকালে এক গ্লাস পাতলা ডাল আর এক গ্লাস মুড়ি কিনে খেতে হতো। দুপুরে ২ প্লেট ভাত, এক গ্লাস ডাল ও একটি আলু ভর্তা কিনে কখনো দুজন খেয়েছে। বিকালে বা রাতে মুড়ি চানাচুর বা ভাজি ভাত খেয়ে রাতগুলো কেটেছে। আহ্ এর ভেতরেও কতো প্রশান্তি ছিলো!

 

১৯৯৯ সালে সোবহানিয়া মাদরাসায় যারা পড়েছেন গাছের নিচে রাতে ঘুমাইতে হতো। কখনো রাতে বৃষ্টি শুরু হলে ছাত্র শিক্ষক সবাই বিছানা মাথায় নিয়ে বসে বসে রাত কাটাতে হতো। সকালে আবার কাঠাল তলায় ছবক শুরু হয়ে যেত।

 

কাসেমি এমনিতেই ছাত্রদের নিকট তুমুল জনপ্রিয় মুরুব্বি হয়ে যাননি। এর জন্য হযরতকে ছাত্রদের পেছনে দিবানিশি হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়েছে। আদর্শ ছাত্র গড়ে তুলতে তিনি যে কস্ট করেছেন; যারা তাকে দেখেননি- তার পরিশ্রম দেখেনি তারা তা কল্পনাও করতে পারবেন না। পরবর্তীতে সিনিয়র ছাত্ররা নতুন ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতো, আল্লাহ তাঁর খাজানা খুলে দিয়েছেন। এখন যার যা খুশি খাও।

 

সাহবানিয়া থাকাকালীন এভাবেই ছাত্রদের জীবনের অনেকটা সময় পার হয়েছে। অথচ কোন ছাত্র এসব বিষয় অভিভাবককে জানানোর প্রয়োজনবোধ করতো না। এত কষ্টের জীবনটা আনন্দে ভরে উঠতো যখন আল্লামা কাসেমি সাহেব হুজুর ডাক দিতেন- আমার বাজিরা (আমার বাবাজিরা) বা এই ছেমরা (এই ছেলে) বলে।

 

ছাত্ররা নিজেদের ঘরবাড়ির পরিবর্তে তাঁর সান্নিধ্যে থাকতেই বেশি ভালোবাসতেন, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। সত্যিই তিনি সাচ্চা ওয়ারিসে নবী। মানুষ গড়ার কারিগর। লাখো দিশাহীনের আলোর ফেরিওয়ালা। উম্মতের এক জাগ্রত রাহবার মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী।

 

তার মহামূল্যবান অমর বাণী:

 

তিনি প্রায়ই বলতেন, বাজি! আমি আমার ছেমরাদের ব্যপারে গাফেল নই। তিনি আরো বলতেন, কারো উন্নতি অগ্রগতি দেখে ঈর্ষান্বিত না হয়ে অধ্যাবসায় করো। কামিয়াবির পিছনে না দৌড়ে জাতির হেদায়েতের পেছনে দৌড়াও। আরও বলেন, নিজের ফিকির না করে জাতির ফিকির করো, কারন তোমার বিষয় তো মালিকের সংরক্ষণেই আছে।

 

তিনি বলতেন, বাযি! বড়দের সমালোচনায় লিপ্ত হয়ো না। বড়দের সমালোচনা থেকে নিজেকে রক্ষা করো। স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব দেশ ও জাতিসত্ত্বা এসবই তোমার উপর অর্পিত আমানত। এগুলোর যথাযথ হেফাজত করো। তিনি প্রায়ই বলতেন, বড়রা সাগরের পানির মতো। হাজারো নাপাকীতে যেমন সাগর নাপাক হয় না, ঠিক বড়দের আস্তিনও নাপাক হয় না। আর আমি তুমি লোটার পানির মতো, এক ফুটাতেই নাপাক হয়ে যাবো।

 

মনন ও মিশন:

 

জাতির ফিকিরে আল্লামা কাসেমীর হৃদয় সদা বে-চাইন থাকতো। কোমলতা তার হৃদয় ছুঁয়ে যেত। মানুষ গড়ার তন্ময়ে ছুটতেন বন্ধুর প্রান্তর। রজনীভর নিমগ্ন থাকতেন ইবাদত কিংবা তিলাওয়াতে। দিবসে তাঁর গর্জনে ভন্ডুল হয়ে যেত বাতিলের তাসের ঘর।

 

 

লেখক: মুফতি ওযায়ের আমীন: মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস, জামেয়া রাহমানিয়া দারুল ইসলাম মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা। কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, খেলাফত মজলিস।