jagannathpurpotrika-latest news

আজ, ,

সর্বশেষ সংবাদ
«» জগন্নাথপুরে মিরপুর ইউনিয়নে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী শেরীন বিশাল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত «» ছাত্র মজলিস শ্যামপুর থানার বার্ষিক কর্মী সমাবেশ অনুষ্ঠিত «» জগন্নাথপুরে রাত পোহালেই ভোট যুদ্ধ শুরু ॥ কে হচ্ছেন সেই ভাগ্যবান চেয়ারম্যান «» ছাতকের কিলবার্ণ এন্ড হামস্টেড মুসলিম কালচারাল সেন্টারের ইমাম ও খতিবকে সংবর্ধনা «» ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহযোগী সদস্য সমাবেশে আবাসিক হলগুলোতে গড়ে ওঠা টর্চার সেল ধ্বংস করতে হবে: ছাত্র মজলিস «» ছাত্র মজলিস ঢাকা মহানগরী উত্তরের বার্ষিক সহযোগী সদস্য সমাবেশ অনুষ্ঠিত «» প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি নিয়ে কটাক্ষ, সিলেটের মোগলবাাজার থেকে আটক ১ «» ছাত্রলীগের মিছিলে খুনের রক্ত: ভিপি নুর «» ছাত্র জমিয়তের মতবিনিময় সভায় অাগামি ১১ জানুয়ারী সিলেট বিভাগীয় সদস্য সম্মেলন ঘোষণা «» ফেসবুক ব্যবহারকারীদের উদ্দেশ্যে শাহীনুর পাশা চৌধুরীর কিছু কথা



সুনামগঞ্জে ভূঁয়া ডাক্তার দিয়ে ব্যবস্থাপত্র ও রিপোর্ট

সাইফ উল্লাহ :: থাইরয়েড (গলা ফোলা) আক্রান্ত এক হতদরিদ্র রিকশাচালক রোগীকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে ভুলবাল টেস্ট দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ায় অভিযোগের প্রেক্ষিতে রোগীকে ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিয়েছে সুনামগঞ্জ বিএমএ (মেডিকেল এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দ) নেতৃবৃন্দ। ‘শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামের ওই নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটি সুনামগঞ্জ পৌর শহরে এক বছর ধরে ভূয়া ডাক্তারদের দিয়ে ব্যবস্থাপত্র প্রদানসহ ভুল ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট দিয়ে অসহায় ও হতদরিদ্র লোকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওই চক্রটি একটি রিকশাচালক সিন্ডিকেটকে কমিশনের মাধ্যমে রোগীদের প্রলোভন দেখিয়ে টেস্ট-বাণিজ্যে মেতে ওঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক থাকলেও এটা ছাড়াই অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের খবর পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ আছে এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানটি জেলার কয়েকজন হলুদ সাংবাদিককে সুবিদা দিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রভাব খাটিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সুনামগঞ্জ বিএমএ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নাককান গলা রোগে অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও ওই হাসপাতালের হেড নেক সার্জন এবং বিএমএ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সেক্রেটারি ডা. নূরুল ইসলামের কাছে এক হতদরিদ্র রোগীকে বিনামূল্যে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার জন্য ৩১ মে পাঠিয়ে দেন শহরের এক ব্যক্তি। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সাক্তারপার গ্রামের হতদরিদ্র রিক্সাচালক এরশাদ আলীর কিছুদিন আগে গলায় থাইরয়েড রোগ দেখা দিয়েছে। ওই রোগী গত ৩ মে গলার সমস্যা নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের খোঁজে সুনামগঞ্জ শহরে আসেন। ওই সেন্টারের কমিশনপ্রাপ্ত রিক্সাচালক গোলাপ মিয়া তাকে ‘কম টাকায় বড় ডাক্তারের সেবা’ দিবেন বলে নাম সর্বস্ব ‘শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এ নিয়ে আসেন।

এখানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তার মো. সাবিরুল ইসলাম তাকে এক্সরে, রক্ত-পরীক্ষা, পেটের আল্ট্রাসনো এবং গলার (থাইরয়েড) পরীক্ষার ব্যবস্থাপত্র দিয়ে শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই টেস্ট করাতে বলেন। ডাক্তার তাকে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে ৪০০ টাকা রেখে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শহিদ মিয়াকে ডেকে টেস্ট করানোর জন্য রোগীকে তার কাছে দেন। শহিদ মিয়া রোগীকে কিছু না বলেই টেস্টগুলো করে তার কাছে তিন হাজার টাকা দাবি করেন। কিন্তু হতদরিদ্র রিক্সাচালক টাকা না থাকায় বাইরে এসে পরিচিত একজনের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নিয়ে শহিদ মিয়ার কাছে দেন।

ডা. সাবিরুল ইসলামের ওষুধ খাবার পরই আরো সমস্যা দেখা দেয় এরশাদ আলীর। ওই দিন এক ব্যক্তি এরশাদ আলীকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে ফ্রি চিকিৎসা করাবেন বলে সুনামগঞ্জ বিএমএর সেক্রেটারি ডা. নূরুল ইসলামের চেম্বারে নিয়ে আসেন। এরশাদকে দেখে এবং তার টেস্ট ও ব্যবস্থাপত্র দেখে ডা. নূরুলের সন্দেহ হলে এরশাদ তার কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। এসময় পাশে সুনামগঞ্জ বিএমএর সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সৈকত দাসও উপস্থিত ছিলেন। অসহায় রোগীর সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে বিএমএ নেতৃবৃন্দ ডায়াগনিস্টক সেন্টারের মালিক শহিদ মিয়া এবং ডাক্তার মো. সাবিরুল ইসলামকে তলব করে রোগীর সঙ্গে প্রতারণার কৈফিয়ত চান। এ সময় শহরের কয়েকজন সাংবাদিকসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গও উপস্থিত ছিলেন। পরে রোগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা ফেরত দেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শহিদ মিয়া। ক্ষমা চান ডা. সাবিরুল। এই ঘটনার ভিডিও চিত্র সংগ্রহে আছে বিএমএ নেতৃবৃন্দের কাছে।

ওইদিন কয়েকজন সাংবাদিক ওই ডায়াগনিস্ট সেন্টারে গিয়ে দেখতে পান, ডা. সাবিরুল ইসলাম ও কানন কুমার দে চেম্বারে বসে আছেন। ডা. কানন কুমার দে’র প্যাডে যে ডিগ্রি গুলো আছে তাও ভুল ভাবে লেখা আছে। প্যাডে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের নামও ভুল করে লেখা আছে ‘উসমানী’। তার প্যাডে মেডিসিন, মা ও শিশু, চর্ম, ও যৌন, ডায়াবেটিস, বাত, ব্যথা, হাড়ক্ষয়সহ আল্টাসনোতে অভিজ্ঞ বলে উল্লেখ রয়েছে। ডা. সাবিরুল ইসলামের প্যাডে আলট্রাসনোতে বিশেষজ্ঞসহ মেডিসিন, মা ও শিশু, চর্ম ও যৌন, ডায়াবেটিস, বাত ব্যথা, এলার্জিতে অভিজ্ঞ বলে উল্লেখ রয়েছে। সদ্য পাশ করে কিভাবে এত রোগে বিশেষজ্ঞ হলেন জানতে চাইলে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি দুই ডাক্তারের কেউ।

এসময় দেখা যায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক মো. শহিদ মিয়া নামসর্বস্ব মিডিয়ায় সাংবাদিক কুলেন্দু, শহিদুল ওসালামকে ফোন করেন। তারা মূলধারার সাংবাদিকদের কথা জানতে পেরে ওই কথিত সাংবাদিকরা তার ফোন কেটে দেয়। এসময় রিসিপশনে কথা হয় সদর উপজেলার ভ্রাম্মণগাও গ্রামের রোকসানা বেগমের সঙ্গে। তিনি হাসপাতালে এসেছিলেন।

হাসপাতালে ডাক্তার না পেয়ে তিনি সুনামগঞ্জের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বিশ্বজিৎ গোলদারের কাছে দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় ওই ডায়াগনিস্টক সেন্টারের কমিশনপ্রাপ্ত রিক্সাড্রাইভার নজরুল মিয়া তাকে ডা. বিশ্বজিতের চেয়ে আরো কম টাকায় ভালো ডাক্তার দেখিয়ে দিবেন বলে নিয়ে আসেন এখানে। তার কথা বিশ্বাস করে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসলে তাকে কয়েকটি টেস্ট দেয়া হয়। এই সময় অপর রোগী দক্ষিণ সুনামগঞ্জের হাসনাবাদ গ্রামের সিজিল বেগমও পাশে বসা ছিলেন। তিনি জানান, তিনি বাড়ি থেকে পুরাতন বাসস্টেশনে নেমে শহরের উকিলপাড়ায় পাইওনিয়র ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডা. মালেকা বাহার লাইলির কাছে দেখানোর আগ্রহ প্রকাশ করলে রিক্সা ড্রাইভার গোলাপ তাকে পাইওনিয়রে না নিয়ে শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে আসেন। এখানে আসার পর ডাক্তার তাকে কয়েকটি টেস্ট দেন।

লোকগুলোর হাবভাব দেখে তার সন্দেহ হলে তিনি ও রোকসানা বেগম তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য চেচামেচি শুরু করেন। এর মধ্যেই দেখা গেল পুরাতন বাসস্টেশন থেকে সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. বাকি বিল্লাকে দেখাতে আসা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার চিনাকান্দি গ্রামের আলকাস উদ্দিন ও তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে এসেছেন শহিদের কমিশনপ্রাপ্ত রিক্সাচালক নজরুল ইসলাম। তারা অন্য রোগীর চেচামেচি শুনে বুঝতে পারেন দালালের খপ্পড়ে নিম্মমানের প্রতিষ্ঠানে চলে এসেছেন। তাই তারাও এখানে না দেখিয়ে মেডিকেয়ারে বিশেষজ্ঞ চেম্বারে চলে যান। এভাবে রোগীপ্রতি ১৫০ টাকা দিয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শহিদ মিয়া রিক্সাচালকদের নিয়োগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। জানা গেছে শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মুক্তি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইউনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ কয়েকটি নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার এভাবে অসচেতন ও অসহায় রোগীদের প্রলোভনে ফেলে দিয়ে ধরে এনে টেস্ট বাণিজ্যে মেতে ওঠেছে।

হতদরিদ্র রিক্সা চালক এরশাদ মিয়া বলেন, আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল রিক্সা চালক গোলাপ মিয়া। সেখানে যাবার পর আমাকে প্রায় ৩ হাজার টাকার টেস্ট দিলে আমি বাইরে এসে ঋণ করে টাকা পরিশোধ করি। আজ ডা. নূরুল ইসলামের চেম্বারে এসে কাগজপত্র দেখালে তারা ডাক্তার সাবিরুল ও ডায়াগনিস্টক সেন্টারের মালিককে ডেকে এনে আমার টাকা আদায় করে দিয়েছেন। আমি খুশি। আমি এদের বিচার চাই।

শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক শহিদ মিয়ার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে শহরের নাম সর্বস্ব কয়েকজন সাংবাদিকের রেফারেন্স দিয়ে তিনি বিষয়টি ঘুরানোর চেষ্টা করেন। পরে তিনি বলেন, রোগী আনার জন্য তিনি কোন দালাল নিয়োগ দেননি এবং তার এখানে কোন নি¤œমানের টেস্টও হয়না। তিনি এসময় তার ল্যটটেকনেশিয়ান উসমানগণি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে তাকে ধরে এনে দেখান।

সুনামগঞ্জ বিএমএ’র সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সৈকত দাস বলেন, আমরা বিষয়টি জানার পরই ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক মালিককে ডেকে এনে প্রতারিত রোগীর টাকা আদায় করে দিয়েছি। গ্রামের সহজ সরল মানুষদের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের নিঃস্বই করছেনা ভুল চিকিৎসা ও ভুল টেস্টে দিয়ে রোগীকে আরো সংকটে ফেলে দিচ্ছে।
এদিকে এই সংবাদ প্রকাশ হলে শহিদ মিয়া, শহিদুল নামের দুই ব্যক্তি বিএমএ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে হুমকি ধমকির অভিযোগ আনলে পুলিশ তাদের খেদিয়ে বিদায় করে দেয়। এ ঘটনার পরই তিনদিন আগে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাহুল চন্দ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। এই খবরে পালিয়ে যায় শহিদ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংশ্লিষ্টরা। এর আগে এই প্রতিষ্টানের পরিচালক শহিদুল ইসলামকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২০ হাজার টাকা দন্ডিত করেছিল। অনাদায়ে তাকে দুই মাসের দন্ড দিয়েছিল। পরে আরেকবার প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করেছিল। এখন হলুদ তিনজন সাংবাদিককে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি খোলা রেখেছে।